“ আমেরিকার ডায়েরি ৯ "
( বিমূর্ত শিল্প)

বিমূর্ত শিল্প কথাটা একটা ফেক শব্দ। আমাদের ভারতে তথা কোলকাতায়, দেশ বা অন্যান্য পত্রিকায় এই বিমূর্ত শিল্প বিষয় নিয়ে লেখা পড়তাম, অনেক ভারি ভারি শব্দ কোটেশন, কবিতা, কাব্য, টেনে এনে দিকপাল শিল্প বোদ্ধারা লিখতেন। আমি যতটুকু জানি বিমূর্তর মানে হল যাহা মূর্তিহীন বা অনঅবয়ব বা যাহা মূর্ত হয়নি যাকে ইংরাজিতে বলে ফর্মলেশ। তাহলে এই শব্দটি আসে কোথা থেকে? সাদা ক্যানভাসও যদি কোন বিপরিত রঙের দেওয়ালে টাঙানো হয় সেখানেও কিছু রুপ বা কথা উঠে আসে। একটি শান্ত জলাধারে পাথর বা মাটির ঢেলা ছুড়ে মারলে জলে অনেক গোলাকৃতি রেখার বা তরঙ্গের স্মৃস্টি হয়। ক্যানভাসে ও লাইন রঙ রুপ মানে ফর্ম দিয়ে স্মৃস্টি হয় চিত্রকলা, যাকে বলি আর্ট। সেই আদিম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ স্মৃস্টি করে চলেছে এবং নিজের অভিব্যাক্তিকে নানা ভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করেছে বা করছে। প্রেক্ষাপট গুহার দেওয়াল থেকে অনেক তল বা সার্ফেস পেরিয়ে ডিজিটেল ও আরো ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে পৌঁছেছে। স্মৃস্টিতেও এক ঘেয়েমি কাটানোর তাগিদে যুগ যুগ ধরে তৈরি হয়েছে না না স্কুল বা ধারা যা শিল্প ইতিহাস পড়ে জানতে পারি কিন্তু এই বিমূর্ত শব্দটি আমি মেনে নিতে পারছিনা। অ্যাবস্ট্রাক্ট শব্দটির বাঙলা মানে বিমূর্ত নয় বা বাঙলা শব্দে নেই বা থাকলেও আমার জানা নেই। মডার্ন পোস্ট মডার্ন এর পর অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট শুরু হয়েছিল ১৯১২ কি ১৩ সালের দিকে রবার্ট ডেলোনি নামে ফরাসি শিল্পী দ্বারা তবে টার্নারের কাজকে কি বলব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই কিউবিজুম অ্যাবস্ট্রাক্টইজুম ইউরোপ ও আমেরিকায় রমরমিয়ে চলেছিল। শিল্পের ইতিহাস নিয়ে আলোচনার বিষয় আমার নয় শুধু বিকৃত করে একটা শব্দকে ব্যাবহার করার বিপক্ষে আমার এই লেখা। পাশ্চাত্য দেশের প্রতি আমরা এত বেশী নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি তাতে আমরা নিজের দেশে বহু শতাব্দী ধরে এই অ্যাবস্ট্রাক্টইজুমের চর্চা হয়েছে সেই কথা কাউকে লিখতে বা বোলতে দেখিনি। আমাদের দেশে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ থেকে পূজা পাঠ বা না না ধর্মপন্থা চর্চায় জ্ঞানি লোকেরা প্রতিকি চিহ্ন বা ডায়েগ্রাম ব্যাবহার করেছেন। যাকে আমরা তন্ত্র আর্ট বলি সেখানে যে যন্ত্র বা ডায়েগ্রাম ব্যাবহার হত তার যে দার্শনিক ব্যাখ্যা কত খানি গভীর তা উপযুক্ত শিক্ষা বা মনন ছাড়া সম্ভব নয়। আর্ট শুধু আর্টের জন্য নয়। আর্ট এক নান্দনিক গভীর জ্ঞানের চর্চা। শিল্পীর নিজের উপলব্ধির বহিপ্রকাশ অন্যদেরও এক অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়।শিল্পের প্রকাশের যে কোন আঙ্গিক হোকনা কেন তাকে শিল্পের ছয়টি সিড়ি ভাঙতে হবে যাকে শিল্প ষড়ঙ্গ বলে জানি। বিশ্ব শিল্পে রেনেসাঁর আগে বা পরে রাজন্য বর্গ ও ধর্মগুরুদের সান্নিদ্ধ্যে যে সকল শিল্প কর্ম হয়েছে তার সিমাবদ্ধ্যতা পেরিয়ে শিল্পীরা যখন মুক্ত মনে নিজেদের স্মৃস্টি শুরু করল শিল্প ইতিহাসে সে এক নুতন অধ্যায়। শিল্পের ইতিহাসে তার না না নামকরন হল রিয়েলিজুম , রোমান্টিসিজুম, ইমপ্রেসানিজুম ,ডাডাইজুম ,সারিয়েলিজুম, কিউবিজুম, অ্যাবস্ট্রাক্টইজুমের , মডার্নিজুম, পোষ্ট মডার্ন, কনসেপ্চুয়েলিজুম এবং কন্টেম্পুরারি , আরো অনেক ধারায় শিল্পীরা কাজ করেছে বা করে চলেছে। আগে স্মৃস্টি পরে ইতিহাস। হিস্ট্রি অফ আর্টের অনেক মোটা মোটা বই পড়ে শিল্প স্মৃস্টি হয়না , দেখা, অনুভব আর জ্ঞান উদ্দাম আবেগ মিলিয় ক্যানভাসের সাথে জুড়ে যায় শিল্পীর মন, স্মৃস্টি হয় শিল্পের। অনেক শিল্প বা আর্ট নিয়ে লেখা হল এখন অন্য কথায় আসি। বেশ কিছু দিন লিখতে পারিনি কারন কয়েকটি মিউজিয়াম দেখা তার সাথে নুতন কাজ নিয়ে সময়করে লিখার জন্য বোসতে পারছিলামনা। আজ সকালে নুতন ছবি শেষ করলাম। দেশে ফেরার আগে বাকি লেখাটুকু সমাপ্ত করব। আর এক সপ্তাহ পরেই দেশে ফিরছি , আমেরিকার আরো অনেক কিছু বিষয় নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে ফিরে লিখব। ডিসেম্বরের ২৮ তারিখে সকালে আমরা সবাই মিলে রওনা হলাম ফিলাডেলফিয়ার বিখ্যাত আর্ট মিউজিয়াম দেখতে। ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অফ আর্ট চোখে না দেখলে কাউকে বোঝানো সম্ভব নয় একটা মিউজিয়াম কত বড় হতে পারে বা তার সংগ্রহ শালায় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিল্প যত্নে সুরক্ষিত আছে। রাত্রি থেকে বৃষ্টি হচ্ছে , তারি মধ্যে আমরা রওনা হয়েছিলাম। কুয়াশার মত ধুয়াটে রাস্তায় সামনে গাড়ীর পেছনের লাল আলোটুকু কোন রকম দেখা যাচ্ছে। এগারোটার সময় আমরা ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অফ আর্টে প্রাসাদতম অট্টালিকার সামনে পৌঁছে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং এ গাড়ী রেখে উপরে উঠেএলাম, তখনও সামান্য বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তা পার হয়ে মিউজিয়ামের ভিতরে ঢুকলাম দরজায় সিকিউরিটি আমাদের নমস্তে বলে অভিবাদন করে ভিতরে যেতে বলল।চিনতে ভুল হয়নি যে আমরা ইন্ডিয়া থেকে এসেছি। ভিতরে কোট রাখার রুমে আমাদের গরম জামাকাপড় রেখে এসে কাউন্টারে টিকিট কাটলাম কুড়ি ডলার করে টিকিট, টিকিটের সাথে আমাদের প্রত্যেককে একটিকরে ব্যাচ দিল। আমরা প্রথমে তিন তলা থেকে দেখতে দেখতে নিচের তলায় নেমে আসব। কারন প্রতিটি ফ্লোর প্রায় আড়াই তলার সমান , সিড়িদিয়ে উপরে ওঠার থেকে নিচে নামা সহজ তাই আমরা এলিভেটরে করে তিন তালাতে চলে গেলাম, অত বড় এলিভেটর আগে দেখিনি যেন একটি ঘর ওপর নিচে উঠানামা করছে। তার আগে ফার্স্ট ফ্লোরে সিড়ি দিয়ে উঠে প্রথমে যে হলটিতে ঢুকলাম সেখানে আর্মার রাখা আছে পনের ষোল শতাব্দীর যুদ্ধের লোহার বর্ম ও না না রকমের অস্ত্রসস্ত্র ইংল্যান্ড ,জার্মানি, ইউরোপ, আমেরিকার, এবং বাহিরের বারান্দার দেওয়াল জুড়ে চল্লিশ পঙ্চাশ ফুট সাইজের টেপিস্ট্রি সতের আঠার শতাব্দীর সারি সারি করে টাঙানো । তারপর এলিভেটরে করে তিন তলায় চলেগেলাম। সেখানে চোদ্দ , পনের শতাব্দীর টেম্পেরা পেন্টিং বাইবেলের কাহিনীর বা উচ্চস্তরের ধর্ম জাতকের ছবি সেই ছবি দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যায় আর্টিস্টের কতখানি অধ্যবসায় ও কলানৈপুন্য থাকলে এই রকম কাজ করা যায়। তখন কার দিনে আর্ট মেটিরিয়ালের দোকান ছিল না । ন্যাচারেল রং দিয়ে রঙের সাথে বাইন্ডার মিলিয়ে কাজ করেছে। এই দেখতে দেখতে আমরা ভারতিয় বিভাগে গিয়ে দেখলাম দক্ষিন ভারত থেকে এক বিশাল আকারের মন্দির প্রাঙ্গন উঠিয়ে নিয়ে এসেছে অযত্নে মন্দিরের পাশে ভগ্নাবস্থায় পড়েছিল।তারপর মুঘল মিনিয়েচার , বাংলার নক্সিকাঁথা, কালিঘাট পেন্টিং বিড়ালের মুখে গোলদা চিংড়ি ও টিয়া পাখি ,চোলা ডানেস্টির ব্রোঞ্জের মুর্তি বিষ্ণুর ও শিব, বুদ্ধের মুর্তি। ও হাকু সাহার একটি কালসাদা তৈলচিত্র । বিদেশের মিউজিয়ামের ভেতর নিজের দেশকে দেখে আনন্দে মনটা ভোরে গেল। তারপর রোম ,চিন , জাপানের পুরানোদিনের ঘরবাড়ী তাদের শিল্প দেখলাম, কিন্তু এত পুরানো কাজ দেখে মন ত ক্লান্ত হয়না সেই আনন্দ ও পূর্নতায় মন ভরে যায়। সারা বিশ্বের শিল্প কর্ম ও আমেরিকান আর্ট, পুরানো, কন্টেম্পুরারি সবের সমন্বয় দেখলাম, কোথাও স্কিল কোথাও নুতন ভাবনা দিয়ে স্মৃস্টি । বিকেল পাঁচটা পযর্ন্ত ঘুরে দেখতে দেখতে পা আর চলছে না। মাঝে আধা ঘন্টার জন্য লাঞ্চ করতে মিউজিয়ামের কাফেতে গিয়েছিলাম। মোবাইলের পেডোমিটারে দেখলাম ছয়কিলোমিটারের একটু কম হাঁটা হয়েছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম আমার আর এক ছাত্র মদন ভিমরির বাড়ীতে আগেথেকে বলাই ছিল তার বাড়ীতে ডিনার করে প্রিনস্টনে শত্রুঘ্নের কাছে যাব। মদন বার বার তার বাড়ীতে আমাদের ডাকছে সে নিজে এসেও নিয়ে যেতে চায় তাই তাদের আন্তরিকতা উপেক্ষা করতে পারলামনা। ঘন্টাখানেকের মধ্যে মদনের বাড়ী পৌঁছে গেলাম। সেখানে ঘন্টা তিনেক ছিলাম অনেক গল্পগুজব হল। মদন অন্ধ্রপ্রদেশের ছেলে কিন্তু ব্যাঙ্গালোরে নিজেদের বাড়ী। তার বাড়ীতে ডিনার সেরে আমরা প্রিনস্টনে রওনা হোলাম, চল্লিশ মাইল রাস্তা মিনিট পঁতাল্লিশ এর মধ্যে চলে এলাম। পুনিত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তারপর একটু গল্প করে ঘুমাতে গেলাম। পরের দিন আমাদের অনেক কাজ নিউইর্য়ক যেতে হবে। আগের সপ্তাহে জোয়েল আমাকে ইমেল করেছিল যে খুব জরুরি কথা আছে যেন তাকে ফোন করি। পরের দিন সকালে ফোন করে জানলাম যে উইলিয়ামবার্গ আর্ট হিস্ট্রিমিউজিয়ামের ডাইরেক্টর ইয়োকো নি আমাদের সাথে দেখা করতে চায় এবং সাথে দুটো করে পেন্টিং নিয়ে যেতে হবে। তাই আমাদের প্রিনস্টনে আসা। জোয়েল তার গাড়ী করে সেখানে নিয়ে যাবে । তাই ঠিক হল বড়মেয়ে আমাদের জোয়েলের বাড়ী পৌঁছেদিয়ে তারাও নিউইর্য়ক বেড়াতে যাবে, বড়মেয়ে তার মা ও পুনিত , ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কাছে। আর আমরা যাব হাডসন রিভারের তলাদিয়ে সাড়ে চার কিলোমিটার হলেন্ড টেনেলের মধ্য দিয়ে মেনহাটন পার হয়ে উইলিয়ামবার্গ ব্রিজ পার হয়ে ব্রুকলিনে। আরো কথা হল ফোন করে সবাই মিলে ফিরে জোয়েলের বাড়ীতে ডিনার করে প্রিনস্টনে ফিরে আসব। দুপুর একটা নাগাদ সবাই জোয়েলের বাড়ী রওনা হোলাম ঘন্টা খানেকের মধ্যে আমরা পৌঁছেগেলাম । জোয়েল আমদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমাদের সাড়েতিনটায় এপয়েন্টমেন্ট ছিল, জোয়েলের বাড়ীথেকে উইলিয়ামবার্গ মিউজিয়াম পৌঁছাতে মিনিট চল্লিশ লাগবে বলল। আমরা যে যার গন্তব্য স্থলে রওনা হলাম গাড়ী ছুটছে একটি বড় ব্রিজে উঠলাম খুব পুরানো ব্রিজ, পাঁচ বছর ধরে রিনোভেশান করে একদম নুতন করে দিয়েছে । ব্রিজ পার হয়ে চার লাইনে যাওয়া গাড়ীগুলি দুইলাইনে পরিনত হল কোন গাড়ীর হর্নের শব্দ চেঁচামেচি নেই। কিছুদুর যাওয়ার পর আমাদের গাড়ী হলেন্ড টেনেলে ঢুকল ননস্টপ গাড়ী চলেছে আর জোয়েল আমাকে ইংরেজীর টেন্স শিখাচ্ছে আমাকে আবার পুনরাবৃত্তি করতে বলছে। এত ভাল বন্ধু কম দেখেছি। সে আমাদের জন্য কিছু করতে চায়। জোয়েল নিজে সঙ্গীতজ্ঞ পিয়ানিস্ট। কমপেয়ারেটিভ লিটারেচার নিয়ে পড়াশুনো করা, ফটোগ্রাফার, আরো যেন কোন অর্গানাজেশানের সাথে যুক্ত । হলেন্ড টেনেলের মধ্যে থেকে ইয়কো নি কে ফোনে বলল আমরা একটু পরেই পৌঁছাছি রাস্তায় গাড়ীর গতি মন্থর হওয়ার জন্য দশ পনের মিনিট দেরি হতে পারে । আমরা হলেন্ড টেনেল থেকে বেরিয়ে মিনি চায়না, কানাল স্ট্রিট পার হয়ে এগিয়ে চললাম তারপর উইলিয়ামবার্গ ব্রিজ দুইদিকে গাড়ীর রাস্তা মাঝখানে ট্রেন তার উপরে হেঁটে যাওয়ার রাস্তা । আমরা পৌঁছ গেলাম মিউজিয়াম বিল্ডিংএর নিচে। গাড়ীর ডিকি থেকে আমাদের পেন্টিং জোয়েলের দুটো ফটোগ্রাফ নামালাম ,সে কেরালার কুনুরের থ্যেয়াম উৎসবের নাচের ও ফিসারমেনের ছবি দিচ্ছে। কলিং বেল দেওয়ার পর একটি ছেলে নাম রিচার্ড দরজা খুলে দিল দুটো ছবি নিয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠে গেল আমরা বাকি কাজ নিয়ে তাকে অনুসরন করলাম। ইয়কো নি তখনও এসে পৌঁছায়নি। কিছু পরে সে এসে গেল জাপানি ছোটখাট চেহারার বয়ষ্কা মহিলা । আমাদের কথা ও পেন্টিং সম্বন্ধে আগে থেকে জানে তাও করমর্দন হল। সে বলল তোমাদের ইন্ডিয়া ফিরে যাওয়ার আগে দেখা হয়ে খুশি হলাম। প্রথমে আমাদের ছবি দেখল জিজ্ঞেস করল তুমি কি ক্লাসিক পেন্টিং নিয়ে পড়েছ । সোনার তবক লাগানো একটি কালো সাদা অন্যটি রঙিন। মেয়ের দুটো চারকোলের কাজ ,বলল অনেক পুরান সিভিলাইজেশান এর দেশ ইন্ডিয়ান কন্টেম্পুরারি কাজ কেন উন্নত মানের নয়। আমি বললাম আমাদের দেশে কন্টেম্পুরারি আর্ট খুব ইয়াং সময় লাগবে। ইয়কি নি অনেক আগে ইন্ডিয়াতে এসেছিল আর্টিস্ট সুধীর পট্টবর্ধনের বাড়ীতে ছিল। যাই হোক অনেক কথা আলোচনা হল । একটা এক্সজিবিশান চলছে প্রায় থার্টি পার্সেন্ট কাজ বিক্রি হয়েগেছে লাল টিপ পড়েছে। আমাদের এই শো অন্য আর্টিস্টদের সাথে গ্রুপ শো সাতাশে জানুয়ারী থেকে সাতাশে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সেখানে ঘন্টার বেশি কাটিয়ে জোয়েল আমাদের একটি আর্টের বইয়ের দোকানে নিয়েগেল সেখানে জোয়েল তার এক বান্ধবীর সাথে আলাপ করিয়ে দিল, নাম হেনা না হালপার, আগে থেকে দেখা করার কথা ছিল তার মা আমেরিকার বিখ্যাত কন্টেম্পুরারি সিরামিক্স পটার আর্টিস্ট , নাম এস্টেলা হালপার। হেনা অনেক বার ভারতে এসেছে। ব্যাঙ্গালোরে কোন আশ্রমে সে যায়, যোগা ও মেডিটেশন করে। নিউইর্য়কে ও সেন্টার আছে বলল। হেনার মেয়ে ও আর্টিস্ট ।সে মেয়ের কাছে নিউইয়ারে কয়েক দিনের জন্য এসেছে। হেনার বাড়ী ফিলাডেলফিয়াতে, আগের দিন আমরা সেখানে মিউজিয়াম দেখতে গিয়েছিলাম, আবার এলে দেখা হবে বললাম আর ব্যাঙ্গালোরে আসার নেমন্তন্ন করে এলাম। বাহিরে খুব ঠান্ডা তাই বেশ কিছুক্ষন বইয়ের দোকানেই ছিলাম। এখন জোয়েলের বাড়ী ফেরার পালা , বড় মেয়েকে ফোনে বলে দিলাম যে আমরা ফিরছি তোমরা চলে এস, বইদোকান থেকে বেরিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। ফুটপাতে হাতে তৈরী না না রকম ডিজাইনের গহনা সৌখিন জিনিষ এই ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে বিক্রি করছে। রাস্তার ধারে পার্কিং করে রাখা গাড়ীর কাছে গিয়ে আমরা রওনা দিলাম জোয়েলের বাড়ীতে। একটু ঘুরে উইলিয়ামবার্গ ব্রিজে উঠলাম তখন হাডসন রিভারের উল্টোদিকথেকে পুরো নিউইর্য়কের ম্যেনহাটন শহর আলোর সজ্জায় ঝলমল করছে , আগের রাস্তাদিয়ে ফিরতে লাগলাম কোথাও ট্রাফিক পেলামনা তাড়াতাড়ি ইউনিয়ানে জোয়েলের বাড়ী পৌঁছেগেলাম, আমাদের আগেই বড় মেয়েরা চলেএসেছে। আমি বললাম জোয়েল আই এম ফিলিং হাঙ্গরি। ঘরের ভিতরে গিয়ে একটি ভাল চাইনিজ রেঁস্তরার মেনুকার্ড নিয়ে এল , বলল কে কি খেতে চায়, সে নিরামিষ খেতে ভালবাসে ,কিন্তু মাছ খায় একটা প্রনডিস বাকি নিরামিষ অর্ডার করা হল মিনিট কুড়ি বাদে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে । আমি জোয়েলের সাথে গিয়ে খাওয়ার নিয়ে এলাম। সবাই মিলে টেবিল ঠিক করা হল তারিমধ্যে জোয়েল সেলাড বানিয়ে ফেলল। ওয়াইনের অনেকগুলো বোতল রাখা গেষ্টদের জন্য, আমি একটু পান করলাম। খেতে বোসে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা তার ফেমেলি পরিবারে গল্প তার প্রফেশান নিয়ে গল্প, ডিনারের শেষে সে আমাদের পিয়ানো বাজিয়ে শুনালো। তার পর গ্রুপ ছবি উঠালো তার আমাদের প্রতি এত আন্তরিকতা দেখে অবাক হই , জোয়েল একা, সম্প্রতি মাতৃ বিয়োগ হয়েছে। বাড়ীতে আর কেউ নেই বান্ধবী এখন ইউরোপ ভ্রমনে গেছে। জোয়েল তার পৃথিবী ভ্রমনের উপর ছবি নিয়ে একটি মোটা ভলিউমের বই পাবলিশ করছে। তাড়াতাড়ি বেরোবে। তারপর জোয়েলের কাছে বিদায় নিয়ে রাত্রি এগারোটার পর প্রিনস্টনে ফিরে এলাম। খ্রিস্টমাসের আগের দিন আমরা ওয়াশিংটন ডিসি তে স্মিতসুনিয়ান পোট্রেড মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে ছিলাম সেখানে ও এত ছবি, স্কাল্পচার দেখে যেন শেষ হয়না। সেদিন সাত কিলোমিটার মিউজিয়াম কক্ষে হাঁটা হয়েছিল । আমেরিকার চুয়াল্লিশ জন প্রেসিডেন্টের পোর্ট্রেট আছে শুধু ডোনাল্ড ট্রাম ছাড়া, ওবামার ও তার বৌ মিশেলের ছবি আলাদা আলাদা কক্ষে রাখা আছে। তাছাড়া আরো অনেক শত শত পুরানোদিনের পেন্টিং আছে। অনেক গুলি বড় হল নিয়ে বিল ট্রেলার নামে এক আফ্রিকান আমেরিকান আর্টিস্টের ছোট ছোট কাজ আমাদের দেশের সাঁওতাল পট চিত্রের মত জল রঙে আঁকা। কুড়ি দশকের প্রথমের দিকের কাজ সে আমেরিকার সিভিলরাইট মুভমেন্টের সাথে ও যুক্ত ছিল। কত কিছুর ইতিহাস মিউজিয়ামের কাল কুঠরিতে জমা আছে। আর একটি স্কাল্পচার আমাকে অভিভুত করেছে শুকনো কাঠের মোটা সরু ডাল পেরেক দিয়ে গেঁথে একটি ঘোড়ার স্টাকচার আমরা যখন যত্ন নিয়ে দেখছিলাম পাশের সিকিউরিটি আমাদের বলল যে ওটি ব্রোঞ্জের তৈরী দুইটন ওজন আমি হাত দিয়ে টোকামেরে দেখলাম সত্যিই তাই কারন শুকনো কাঠের গুড়ির মোল্ড রঙের পাতিনা দেখে আমার মনে কৌতুহল হয়েছিল কিভাবে করা। তাই হাত লাগিয়ে ছিলাম আর একটি ব্যাপারে অবাক হলাম একজায়গায় লেখা আছে ফোটোগ্রাফি মোস্ট এনকারেজ। শান্তিনিকেতনে কলাভবনে ছবি তুলতে গিয়ে অনেক কথা শুনিয়েছিল। পরশুদিন সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক দেখছিলাম সেখানে উৎপল দত্তের মুখে একটা কথা শুনা যাচ্ছিল কুপমন্ডুক। শুরু করে ছিলাম বিমূর্ত শিল্প নিয়ে, কিছু বলা কিছু না বলার মধ্যদিয়ে অনেক কিছু বলা যায়। আর্টিস্টের মন হবে আকাশের মত উন্মুক্ত বিরাট তা নাহলে এত রং , ভাবনা, কল্পনা, রাখার জায়গা হবে কোথায়?……………….

“ আমেরিকার ডায়েরি ১১ “
(আছে কত রঙ ক্যানভাসে )

অনেক দিন বাদে রং নিয়ে খেলায় মেতে উঠেছি। ক্যানভাসের উপর দিয়ে নদীর প্রবাহের মত বয়ে যাবে রং, আমি তুলি ধরবো না। সে আপন ইচ্ছায় ক্যানভাসে দেবে প্রাণ। আমি শুধু জোগারদার। গত তিন মাস মনটা কুরে কুরে খাচ্ছে মনে হচ্ছে কখন ছবি নিয়ে নাটক শুরু করি। ক্যানভাস হল রঙ্গমঞ্চ আর রং ও ফর্ম করবে নির্বাক অভিনয়। এ দেশে সব বিষয় নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা হয় , তবে শিল্প কি আর বাদ যায়। আর্ট মেটিরিয়ালসের দোকানে গেলেই চোখে পড়ে শিল্প স্মৃস্টির উপাদান গুলি। তা দেখে মনে হয় শিল্পীরাও নিরন্তর নুতন ভাবনা অন্য স্বাদের স্মৃস্টির কাজে লেগে আছে। জলরঙ ,তেলরঙ, অ্যাকরেলিক, গুয়াশ, টেম্পেরা, পেস্টেল, এনকস্টিক, চারকোল আরো কতকি মাধ্যমে শিল্পীরা কাজ করে, এখন অভিব্যক্তির মাধ্যম পুরানো রিতিনিতিকে ছাড়িয়ে গেছে যেমন ইনস্টলেশন , পারফর্মিং আর্ট, ডিজিটাল আর্ট, থ্রি ডি ফটোগ্রাফি, অপটিক্যাল লাইটিং, হলোগ্রাম, আরো অনেক কিছু আমি সব জানিনা। বেশ কিছু দিন দেখছি ইউরোপ, আমেরিকায় ফ্লুইড অ্যাকরেলিক রঙের মাধ্যমে অনেক আর্টিস্ট কাজ করছে। বছর চারেক আগে ইংলেন্ডের এক মহিলা আর্টিস্ট নাম নেন্সি উডের কাজ দেখে আমি অনুপ্রানিত হয়ে ছিলাম,এবং যোগাযোগ ও হয়েছিল,তার বেশি এগোয় নি। নুতন ধরনের কাজ করব সেই চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। ট্র্যাডিসনেল ভাবনাচিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নুতন ধরনের কাজ করতে হলে মুক্ত চিন্তার সাথে আর গোঁড়ামো না কাটাতে পারলে নুতন ধরনের কাজ করা সম্ভব নয়। ছাত্র জীবন থেকে প্রথাগত প্রদ্ধতি না মেনে চলাই ছিল আমার স্বভাব। সে যাই হোক এদেশে এসেছি কতকি দেখছি, মনের ভিতর তোলপাড় খাচ্ছে কিছু করি। মেয়ে আঁকার প্রচুর জিনিষ পত্র সাজসরঞ্জাম এনেদিয়েছে বলছে তোমার প্রাণ যা চায় তাই কর, ছবি আঁক, লিখ, বই পড়, আর যদি কিছু করতে না চাও বিশ্রাম কর। এতই কি সহজ যে বোসলেই ছবি বেরিয়ে যাবে । এক এক সময় মনে হয় সব ভুলে গেছি কিছু ই মাথাথেকে বের হচ্ছে না। স্মৃস্টি করার প্রসব যন্ত্রণা মনকে ক্ষত বিক্ষত করে। তার পর যদি কিছু জন্ম নেয় নেবে তা নাহলে মৃত ভ্রুন জন্ম নেবে মুক্ত ক্যানভাসে। গত দুই মাসে নুতন ধরনের কাজ করব বলে জেরি, ব্লিক আর্ট মেটিরিয়ালসের দোকানে ও বল্টিমুরে মাইকার আর্ট কলেজের দোকানে ঘুরে ঘুরে জিনিষপত্র নিয়ে এলাম। এদিকে ছোট বড় কয়েকটি ক্যানভাস বানিয়ে রেখে গিয়েছিলাম প্রিনস্টনে শত্রুঘ্নের বাড়ীতে । বিশাল জায়গা, বেসমেন্টে আমার আর মেয়ের জন্য স্টুডিও বানিয়ে দিয়েছে বলছে মনের আনন্দে কাজ করুন। ছোট বড় মিলিয়ে খান দশেক ক্যানভাস। বড় মেয়ের কাছে কাজ শুরু করে ছিলাম শুধু ফ্লুইড মিডিয়ামটা জানার জন্য। কয়েকটি ছোট কাজ নষ্ট হল, কাছে কোন মাষ্টার মশাই নেই যে বলে দেবে এই পদ্ধতি মেনে কাজ করতে হবে। তারপর ধরতে পারলাম, সহজে কি কেউ ধরা দেয় বুড়ো বয়সে রঙের পরীর বড় মলায়ম শরীর, তার সাথে প্রেম করছি। ফ্লুইড রঙের সাথে পোরিং মিডিয়াম মিলিয়ে কাজ করতে হয়। তার ধর্মই হল গড়িয়ে যাওয়া। যত রং লাগবে তত রং নষ্ট হবে। এই পরীক্ষার জন্য করতেই হবে। মেঝেতে ও টেবিলের উপর প্লাস্টিক পেতে সাবধানে কাজ করতে হবে। গেলন গেলন পোরিং মিডিয়াম লাগে। সারা দিন লেগে গেল রং মাখাতে । মেয়ের ঘরের মেঝেতে কার্পেট পাতা, মনে কিন্তু কিন্তু ভয় পাছে কার্পেটে রঙ নালেগে যায় এত কিছু চিন্তা করে কি ছবি আঁকা যায়। গত পনেরই নভেম্বর ভোর ছটায় গ্রেহাউন্ড বাস ধরে বাপ বেটি মিলে চলে এলাম প্রিনস্টনে তারপর বছরের প্রথম স্নোফল দেখলাম মাইনাস চোদ্দ ডিগ্রীতে নেমে গেল তাপাঙ্ক । এদেশে ঘরের ভিতর বোঝাই যায়না বাহিরে কত ঠান্ডা না গরম। এবার শুরু হবে কাজ, আমি করব এক্সপেরিমেন্ট কাজ। মেয়ে করবে সাবজেক্টিভ কম্পজিসান । বিশাল বেসমেন্টে পরিষ্কার করে মেঝেতে রং করে অনেক লাইটের ব্যাবস্থা করা হয়েছে যাতে হাত পা ছড়িয়ে কাজ করতে পারি। আমার কাজের অনেক ঝামেলা , না না রকম জিনিষের দরকার , যেমন সেফ টর্চ ব্লোয়িং এর জন্য, রঙ গুলানোর জন্য কাঠের পাতলা আইস ক্রিমের কাঁঠি , পাতলা রাবার গ্লাবস,অনেক ডিসপোজেবল কাফ, রঙ ও একরেলিক পোরিং মিশিয়ে রাখার জন্য প্লাস্টিক কন্টেনার, সিলিকন তেল, জল ইত্যাদি । এখন শুরু হবে রান্নাবান্না , যে কটি রং দিয়ে কাজ করব আগে থেকে একরেলিক পোরিং মিশিয়ে রাখা রং গুলিকে একটি একটি করে কাপে ঢেলে তাতে ডেনসিটি যেন তফাত না হয় , কাঁঠি ডুবিয়ে একটু উপর থেকে ফেললে সুতোর মত যেন পড়ে ,ড্রপ ড্রপ পড়লে হবেনা। এই সব মাথায় রেখে কাজ শুরু করতে হবে। যেন মনে হচ্ছে মাস্টারি করছি। পঁচিশ বছর মাস্টারি করেছি। স্বভাব যাবে কোথায় । আর্টিস্টরা তাদের গোপন রেসিপি বলতে চায়না। বলবেই বা কেন ? মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়ে, সময়, অর্থ জলানজলি দিয়ে কিছু একটা করল আর সেটি সবাইকে বলা কি উচিত। নুতন মাধ্যম রং এর সাথে সিলিকন তেল মিশিয়ে একটি প্লাস্টিক কাপে একের পর এক অল্প অল্প ঢেলে ক্যানভাসের উপর ঢেলে কাজ করতে হয় এবং ব্লো টর্চ দিয়ে হিট দিয়ে সেল বের করতে হয় , হাতের কায়দায় বিভিন্ন রঙের ফর্মকে কম্পোজ করতে পারলে অসাধারন ছবি করা যায়। আমি এই কয়দিন সেই চেষ্টা করছি , কিছুটা সফল কিছু অসফল হয়েছি। এটি লম্বা পদ্ধতি। সময় ও ধৈর্যের দরকার। কথায় আছে সবুরে মেওয়া ফলে। আমাদের দেশে বিভিন্ন আর্ট কলেজে শিক্ষা প্রদ্ধতি বিভিন্ন রকমের , কোন কলেজে ব্রিটিশ একাডেমিক প্রদ্ধতিতে শিক্ষা, কোন কলেজে মুক্ত চিন্তার বাতাবরনে বিশ্ব শিল্প ইতিহাসের শিক্ষার সাথে অনুশীলন । কোথাও ট্রেডিসানাল ও আধুনিকতার সাথে শিল্প শিক্ষা। আরো নানাবিধ শিক্ষা পদ্ধতি হয়ত আছে আমি জানি না। আর আর্ট কলেজ পাশ করার পর নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদে নানা রকম প্রতিষ্ঠানে চাকুরি নিতে হয়। শিল্পী জীবনের সেটাই হল বড় বিড়ম্বনা। বাকি যারা অনেকে শিল্প চর্চায় নিয়জিত থাকে তারা ও অন্যের পছন্দ মত কাজ করে তৃপ্ত থাকে । শিল্প সাধনা একটা ক্রমাগত উত্তরন অন্তহীন যাত্রা। শুধু সারা জীবন ধরে একি বিষয়ের পুনরাবৃত্তি গতানুগতিক কাজ করা শিল্পীর বোধের অকাল মৃত্যু ঘটে। আমেরিকায় দুই ধরনের আর্ট ইনস্টিউট আছে । এদের পঠন পাঠন আমাদের মত নয়। এদের আর্ট কলেজে প্রফেশনাল শিক্ষা প্রদ্ধতি সাথে তাতে ইনোভেশন, রিসার্চ, মেনেজমেন্ট , প্লেসমেন্ট ইত্যাদির সমন্বয় শিক্ষা দেওয়া হয়। আর কিছু আর্ট কলেজ আছে তারা স্কিলের উপর জোর দেয়না মেন হল আইডিয়া তার সাথে তার যুক্তি থাকবে এবং কাজের সাথে শিল্পীর বক্তব্য যাতে দর্শকের বুঝতে অসুবিধা না হয়। এদেশে ছোট বেলা থেকে স্কুলে শিল্পের শিক্ষা আছে, প্রতিটি ইউনিভার্সিটিতে আর্ট কলেজ আছে। তার উপর মিউজিয়াম, আর্ট গ্যালারিতে ছেয়ে আছে প্রতিটি শহরে। কয়েক সপ্তাহ আগে বল্টিমুরে মাইকা মানে মেরিল্যান্ড ইনস্টিউট কলেজ অফ আর্ট এ ঘুরে এসেছি। সেই সব দেখে মনে হয়েছে আমাদের মত গরিব দেশে কত কি না আছে। শুধু গুছিয়ে নেওয়া, সংরক্ষন করা , নুতন ভাবে শিক্ষা দেওয়া যাতে পরবর্তি প্রজন্ম নিজের দেশটাকে গভীর ভাবে বুঝতে শিখে। আমাদের দোষ হল আলোচনার থেকে বেশী সমালোচনা করি। শিল্প নিয়ে আলোচনা হোক সেখান থেকে নুতন কিছু বেরিয়ে আসতে পারে। যারা শিল্প নিয়ে সমালোচনা করে তারা প্রকৃত পক্ষে অকাট মুর্খ। শিল্পের সমালোচনা হয়না, শিল্পের চর্চা নাকরে কিছু বই পত্র পড়ে কোটেশন নিয়ে এর সাথে ওর সাথে তুলনা করে শিল্পকর্মকে উঁচু নিচু মানে ফেলা অপরাধ। এর বডার লাইন নেই। যুক্তি তর্কের মধ্য দিয়ে শিল্পকর্মের আলোচনায় শিল্প আরো সমৃদ্ধ হয় ও রশিকদের চোখ খুলে দেয়। আর্ট মানে শুধু সুন্দরী মেয়ের মুখ বা অন্য কিছু নয় বা জীবনানন্দের কবিতার মত সুরিয়েলিজুম ভাবের বর্ননা নয়। আর্ট হল একটা সত্ত্বা, জীবন বোধের অভিব্যাক্তির বহির্প্রকাশ। সেটা যে কোন আর্ট ফর্মে হতেপারে। মেরিল্যান্ডে একদিন টিভিতে গৌতম হালদারের মেঘনাদবধ নাটক দেখছিলাম এটি একটি অনবদ্য প্রযোজনা। হাবিব তানবিরের চরনদাস চোর ও রক্তকরবী দেখেছিলাম আর তন্দুলকারে ঘাঁসিরাম কতোয়াল , কোলকাতায় বড় বড় নট্যকারদের নাটক দেখেছি মন ভোরেছে তিল তিল করে সঙ্চয় হয়েছে তার নাট্য রস মনের মনিকোঠায়। আর গান সে আর এক অনুভুতি কত গুনী গায়কের গান ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আব্দুল করিম খাঁর গানের রেকর্ড শুনেছি, আমার ছাত্রজীবনে অনেকের লাইভ কনসার্ট শুনেছি নাচের বেলাও তাই ঘটেছে । দুই হাজার ছয় সালে জাকির হোসেন, সুলতান আলির সাথে আমার যুগলবন্দীর অনুষ্ঠান করার সৌভাগ্য হয়েছে। এই দেখা শুনা যতই হোক তাও যেন মনে হয় আরো অনেক বাকী থেকে গেছে। মনের ভিতর ছাত্র হওয়ার ভাবনা থেকে গেছে। তাই নুতন কিছু শিক্ষার তাগিদে রঙ ও ক্যানভাস সাজিয়ে কাজে বোসে গেছি। একটা বড় ক্যানভাস বেসমেন্ট থেকে উপরে নিয়ে আসার সময় ক্যনভাসের মাঝখান থেকে কাঁচা রঙ সরে গিয়ে কাজটা কেচিয়ে দিল, আমি ছাড়ার পাত্র নয়, গতকাল সকাল থেক বিকেল পর্যন্ত কাজ করে ছবিটি শেষ করলাম এবার শুকানোর পর রেজিন ঢেলে পুনরায় শুকাতে হবে। তারপর ফ্রেম, তবেই ছবির মুক্তি। গত শনিবার শত্রুঘ্নর বাড়ীতে মিলিটারী স্কুলের কয়েক জন বন্ধুদের ও তাদের ফ্যামিলিদের ডেকে ছিল আর জগদীশ প্যাটেল বরোদার থেকে পারর্ফমিং আর্ট পাশ করা। আমার পরিচিত সে। বৌ এর সাথ এসেছিল। এদেশে তিরিশ বছরের বেশী হল আছে সে। প্রফেশানালি অনুষ্ঠানে গান গায়। আমার মিলিটারী স্কুলের পুরানো কলিগ মিষ্টার নাগরাজ স্বস্ত্রিক ও তার ছেলে গিরি ফ্যামিলির সাথে এসেছিল। সব মিলিয়ে তিরিশ জনের উপর হবে। জগদীশ প্যাটেল তার গানের জন্য সাউন্ড মিক্সিং গেজেট, মাইক, পোর্টেবল সাউন্ড বক্স সব বাক্স ভোরে এনেছিল। সেই সভা পরিচালনা করল । প্রথমে আমাকে বলল সবাইয়ের সাথে আলাপ করিয়ে দিতে এবং আমার পুরানো ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে। আমি কিছু বললাম ,নাগরাজ কিছু বলল। আমরা খুব খুশি হলাম যে ছাত্ররা তাদের ফ্যামিলির সাথে তাদের স্কুলের মাষ্টার মশাইদের সাথে দেখা করতে এসেছে। জগদীশ ভাই সুন্দর পুরানো দিনের হিন্দী ফিল্মের গান পরিবেশন করল। আমি ভাবতে পারিনি যে এক জন গুজরাটি এত ভাল গান পরিবেশন করবে। গুজরাটিরা শুধু ব্যাবসা করে জানতাম। তার এক হাজার গান মুখস্ত। গানের শুধু সাউন্ড ট্রেকটা নিয়ে তার সাথে সুরতাল মিলিয়ে পাকা গায়কের মত গান গেয়ে শুনাল। সে এদেশে প্রফেশানালি গানের প্রোগ্রাম ও কমেডি শো করে থাকে। প্রচুর খাওয়া দাওয়া আয়োজন করেছিল পুনিত ও শত্রুঘ্ন, সেই সন্ধ্যেটা সবাই আনন্দে কাটিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বৌ বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ী ফিরে গেল। আশিষ দেওয়ান তার বৌ বাচ্চার সাথে তার বাবাকে এনে ছিল। কারন তার বাবাড ও ব্যাঙ্গালোর মিলিটারী স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। বর্তমান অবসর প্রাপ্ত বায়ু সেনা। তারা নিউইর্য়ক থেকে এসেছিল। সেই রাত্রিটা এখানে থেকে পরের দিন ফিরে গেল। ছবি আঁকার সাথে পুরানো ছাত্রদের সাথে সাক্ষাত এবং এখনো তাদের মাষ্টারদের প্রতি শ্রদ্ধা আছে দেখে আনন্দে মনটা ভোরে উঠল। প্রিনস্টনে আমার পনের দিনের বেশী কাজের মধ্যে কেটে গল। আর দুটাদিন এখানে থেকে মেরিল্যান্ডে ফিরে যাব। জানুয়ারীর পনের তারিখ ফেরার টিকিট , দেড় মাস দেখতে দেখতে কেটে যাবে।……………………….

“আমেরিকার ডায়েরি ১০"
( আমেরিকান লবস্টার )

গত মাসে এনাপলিশ শহর পোর্ট টাউনে গিয়েছিলাম লবস্টার খেতে। সে কথা আগে লিখেছিলাম , কিন্তু লবস্টার খেয়ে কারো খুব একটা ভাল লাগেনি। কথা ছিল একদিন জ্যান্ত লবস্টার কিনে এনে বাড়ীতে বানানো হবে। পরশুদিন প্রিনস্টন থেকে ফেরার পথে এলিকট শহরে লটে সুপার মার্কেটে গিয়ে ছিলাম। সেখানে দেখলাম জ্যান্ত লবস্টার এসেছে ,এক্যোরিয়ামের জলে ঘুরে বেড়াচ্ছে । দুটো বড় লবস্টারের ওজন তিন পাউন্ড হবে। আমাদের দেশের ওজনে এক কিলোর বেশী। দুটো জ্যান্ত লবস্টার নিয়ে বাড়ী ফিরলাম। ওটাকে জলে না রেখে প্যাকেটসহ ভাল করে জড়িয়ে ফ্রিজে ঘুম পাড়িয়ে রাখলাম। এইসব আমার প্রিয় জিনিষ মেয়ে এনে দিচ্ছে। সে তার কাজে এত ব্যাস্ত তা সত্বেও সে আমাদের খেয়াল রাখছে। যখনই সময় পাচ্ছে আমাদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসছে। লবস্টারের অনেক রকম প্রজাতির মধ্যে এটা অন্যতম। আমেরিকান মেয়ে আর লবস্টার দুটোর মধ্যে কোথায় যেন মিল আছে। আন্দামানে যেরকম রঙিন লবস্টার পাওয়া যায় সেরকম নয়, কতকটা ক্রে ফিসের বড় দিদি। কাঁকড়ার মত মোটা মোটা দাঁড়া। বেশ নাদুস নুদুস । এখান কার মেয়েরা ছেলেদের সমতুল্য, কি না পারে। সবদিকে এগিয়ে এখানে নারী স্বাধীনতা সম্বন্ধে স্বামী বিবেকানন্দ একশ বছরের বেশি আগে লিখে ছিলেন। লবস্টারের সাথে কোথায় মিল আছে, যেমন নিজেদের প্রতিরক্ষা করার জন্য লবস্টারের মোটা দুটো সাঁড়াশীর মত হাত আছে , স্বনির্ভর হওয়ার মানসিকতাই উদ্দাম ইচ্ছা শক্তিই এদের সাঁড়াশী। সে যাই হোক পরের দিন কেমন করে লবস্টার রান্না করলাম সেই কথাই লিখছি। পরের দিন ফ্রিজ থেকে ঘুম পাড়ানো লবস্টার বের করে রাখলাম তাদের ঘুম আর ভাঁঙল না। কিছুক্ষন জলে রেখে নরমাল করে চপার বোর্ড়ে রেখে পিঠের দিকে চপার নাইফ দিয়ে ফালিকরে পেট,মাথা থেক সব জিনিষ পরিষ্কার করে বাটার আর তন্দুরি পেষ্ট লবন মাখিয়ে ওভেনে চারশ ডিগ্রী ফারেনহাইট এ কুড়ি পঁচিশ মিনিট রোস্ট করলাম। দেখতে সুন্দর খেতে সুস্বাদু কিন্তু বেশির ভাগই বাদ ভিতরের মিট আড়াইশ খানেক হবে। বেক ভেজিটেবল আর লবস্টার। শুধু খাই খাই সবাই ভাববে হয়ত আমি পেটুক কিন্তু নয়, ভাল খেতে কার না ভাল লাগে। এখন খাওয়ার কথা থাক। তার কয়েক দিন বাদে ভার্জিনিয়ার ফেয়ারফেক্সে টাইসন কর্নার সেন্টার গিয়েছিলাম , সে বিশাল এক শপিং মল, পুরো ঘুরে দেখতে দিন দুয়েক লাগবে, নামিদামী ব্রেন্ডের শোরুম সব জায়গাতে সেল চলছে। আমাদের শীতের কিছু জামা কাপড় কেনা হল । আমি চাইনিজ জেন বডি ম্যাসাজ করালাম। খেতে গেলাম আমেরিকান তন্দুরি বলে একটি রেঁস্তরাতে , লেখা আছে ভারতিয় খাওয়ারের আমেরিকান সংস্করন , সেখানে মুচ মুচে কেল শাক হাল্কা বেসন দিয়ে ভাজা তাতে টক মিষ্টি তেঁতুলের পাল্প ছড়িয়ে দেওয়া, বাটার নান, চিকেন তন্দুরি কাবাব, সেলাড খেলাম, অনেক আমেরিকানরাও খাচ্ছে। রেঁস্তরার মালিক সর্দার ইন্ডিয়ানই হবে, খেয়েদেয়ে ঘুরতে লাগলাম এবং দেখলাম একটি গাড়ীর শোরুম সেখানে নুতন জেনারেশানের নুতন প্রযুক্তিতে বানানো টেক্সেলা গাড়ী রাখা আছে এবং মার্কেটিং এক্সিকিউটিভরা এই গাড়ীর ফিচার সম্বন্ধে বোজাচ্ছে। এই গাড়ীতে তেল লাগেনা সুতরাং পলিউশন ফ্রি, চালক শুধু স্টিয়ার্ং ধরে বোসলেই হবে বাকি কাজ জি পি এস করবে ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রন করবে সেন্সসার। আমি গাড়ীতে একটু হাত বুলিয়ে ভেতরে ঢুকে স্টিয়ারিং ধরে বোসলাম। মেয়ে ছবি তুলে নিল। গাড়ীর দাম আশি হাজার ডলারের কমবেশি । আমাদের দেশে দাম হবে তিন গুন। প্রতিদিন সারা পৃথিবি জুড়ে যে ভাবে ফসিল ফুয়েল পুড়ে কার্বন ডিসচার্জ করছে তার উপর পরিবেশ দুষন হচ্ছে সেই জন্য রিনিউএবল এনার্জি ব্যাবহারে কিছুটা দুষন বন্ধ হবে। এদের না না রকম ইনোভেসান সারা বিশ্বে ব্যাবসা করে রোজগার করে বড়লোক হয় তাই এই দেশটা অন্যদের থেকে আলাদা। আমরা শুক্রবার বল্টিমুরে গিয়ে ছিলাম MICA আর মিউজিয়াম দেখতে । আমাদের বাড়ী থেকে চল্লিশ মিনিটের পথ। ঠান্ডা আর হাওয়াতে হাত পা জমে যাচ্ছিল। মেরিলেন্ড ইনস্টিউট কলেজ অফ আর্ট। আমেরিকার পাঁচ খানা বিখ্যাত আর্ট কলেজের মধ্যে অন্যতম।১৮২৬ সালে তৈরী। বাড়ীটি একটি রাজ প্রাসাদের মত । এক একটি বিষয়ের এক একটি বিল্ডিং । প্রতিটি বিল্ডিং এ একাধিক গ্যালারি, অডিটরিয়াম, ক্লাসরুম সে এলাহী ব্যাপার সেপার। আর্ট মেটিরিয়ালের দুটো দোকান আছে,শহরের একাংশে ছড়িয়ে সমস্ত ডিপার্টমেন্টে।অনেক সময় নিয়ে হেঁটে হেঁটে দেখতে সারা দিন লাগবে। আমাদের দেশে সব স্বপ্ন । শিল্প শিক্ষার প্রচার নেই। সারা দেশে হাতে গোনা কয়েকটি আর্ট ইনস্টিউট । নাআছে শিক্ষিত সোমালোচক, শিল্প সমজদ্দার, পেট্রনেজ। ভাল গ্যালারি , মিউজিয়াম। এই অনিহা আর্টিস্ট মানে অশিক্ষিত লোক। ডাক্তার ,ইঙ্জিনিয়ার , অধ্যাপক,হলে আলাদা সম্মান। আর আমাদের ট্রেডিসানাল শিল্প যাকে আমরা আর্ট বলে চালাই, প্রকৃত পক্ষে ওটা ক্রেফ্ট, বলতে আমাদের কিন্তু কিন্তু মনে হয়। সিভিলাইজেশান ডকুমেন্টরি দেখি । আর মনে হয় এই সময়টা কি দিয়ে ধরে রাখবে তার অস্তিত্বটাকে। ঐ দিন ওখানে ওপেন হাউস ছিল। কলেজের সিনিয়ার ও স্টাফেরা দলে দলে আমাদের নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাল। সব ডিপার্টমেন্টে যাওয়া সম্ভব ছিলনা। নুতন যারা পড়তে চায় তার কাউনসিলিং ছিল। দুপুরে আমরা একটি রেঁস্তরাতে সিগ্নেচার পিৎজা আর কালমারি ভাজা খেয়ে ছোট মেয়েকে তার কাউনসিলিং ক্লাসের বিল্ডিং এ ছেড়ে বল্টিমুরে বিখ্যাত আর্ট মিউজিয়াম দেখতে গেলাম। এদেশের মিউজিয়ামের কথা লিখেছি। প্রতিটি ছোট বড় শহরে মিউজিয়াম কম বেশি আছে। প্রতিটি মিউজিয়ামে দর্শকের সংখ্যা ও কম নয় । সেখানে গিফ্টশপ আছে সেখানে আর্টের বই থেকে সুরু করে মনোরম হাতের কাজের জিনিষে ভর্তি। প্রথমে মিউজিয়ামে পৌঁছে ঢোকার পাশেই গিফ্টশপ । মেয়ের সাথে সেখানে ঢুকলাম এবং কয়েকটি জিনিষ কিনে আমরা মিউজিয়ামে ঢুকলাম । রোমান যুগের মোজাইক মিউরাল থেকে রেনেসাঁর আর্টিস্টের পেন্টিং। মডার্ন ও কন্টেম্পুরারি আটিস্টদের কাজের সমারোহ বিশেষ বিশেষ সময়ের ভাবনা চিন্তার বহিপ্রকাশ উপলব্ধি করা যায়। একটা জার্নি শিল্পের মধ্যদিয়ে যুগ যুগ অতিবাহিত হয়েগেছে । কয়েকটি কন্টেম্পুরারি আর্টিস্ট দেখলাম বিশাল বড় বড় পেন্টিং কুড়ি তিরিশ ফুট করে হবে। অসাধারন মন ছুঁয়ে যায়। মাতিসের স্কাল্পচার দেখলাম সে পাঁচশতাধিক স্কাল্পচার বানিয়ে ছিল ,আমরা তাকে পেন্টার বলেই জানতাম। আর্টিস্ট মার্ক ব্রেডফোর্ড , মেলিকো মোকগোসি,রাইডেনের কাজ দেখলাম। ছোট মেয়ের আরো ঘন্টা দুই সময় লাগবে। সেই সময়টা আমাদের সুন্দর ভাবে কাটল। বড় মেয়েকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ হবেনা আরো কিছু মনের থেকে উঝাড় করে দিতে ইচ্ছে করে । বিকেল পাঁচটারপর আমরা মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে ছোট মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে আমরা বাড়ী ফেরার পথে ওয়ালমার্ট হয়ে পাকিস্তানি রেঁস্তরা থেকে বিরিয়ানী ,কাবাব কিনে বাড়ী ফিরে এলাম। এখন নভেম্বর মাস সরকারী অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের লাইভ সার্টিফিকেট জমাদিতে হবে ব্যাঙ্কে। বিদেশে আসার সময় জেনে এসেছিলাম যে এই সময় আমি বিদেশে থাকব, কি করে লাইভ সার্টিফিকেট জমা দেব। সেখান থেকে ফর্ম দিয়েছিল । সেই ফর্ম নিয়ে ভারতিয় দুতাবাস থেকে এটাস্টেট করে আমাকে ভারতে আমার শহর ব্যাঙ্গালোরে পাঠাতে হবে। তাই গত সোমবার ওয়াশিংটন ডি সিতে ইন্ডিয়ান এম্বাসিতে গিয়েছিলাম । মেসাচুসেস্ট এভিনিউ। ডুপন সার্কেলের কাছে । পার্কিং এ গাড়ী রেখে এম্বাসির গেটের কাছে গিয়ে দেখলাম লেখা আছে পরের দরজা । সেখানে যেতে সিকিউরিটি বলল সেখানে নয় অন্য বিল্ডিং একি রাস্তায় একটু দুরে মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। গাড়ীতে দুই তিন মিনিটের পথ, সে যাই হোক ঘুরে দেখলাম এম্বাসির উল্টোদিকে রাস্তার ও পারে ছোট পার্কে আমাদের জাতির জনক খালিগায়ে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে । এত নিম্ন মানের কাজ মনকে পিড়া দেয়। ডান্ডিমার্চের যে ছবি থেকে করা হয়েছে তা ভারতের বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন স্কাল্পটর দ্বারা তৈরী হয়েছে, সেখানে দালাল আর ভাস্করের ভাগাভাগি বখরার ফলে শিল্পের মূল্যায়ন নিম্ন স্থরের হয়েছে। ভাল খারাপ দেখতে দেখতে এখন বোধের জায়গাটার বোধ হারিয়েছ । এই ঠান্ডায় একটা কাপড় গায়ে গান্ধী সরু একটা লাঠি হাতে ভারতিয় দূতাবাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে । মনে হচ্ছে দৌড়ে গিয়ে একটা কম্বল গান্ধীর গায়ে জড়িয়ে দিই। গান্ধীর কোটপেন্ট পরা অবস্থার ছবি দেখেছি। সেই রকম কি কোন মুর্তি বানানো যেতনা? আমার নিজের চোখে দেখে ও নিজের বিচারে যা মনে হয়েছে তাই লিখলাম। ভাষ্কর্য শুধু প্রতিলিপি নয় তার নিজস্ব কতগুলি গুনগত বৈশিষ্ট আছে তাকে সবসময় মাথায় রেখে কাজ করলে তবেই প্রকৃত ভাষ্কর্যের মৌলিক দিক বজায় থাকে। আমি শিল্প বিশারদ নই তবে মনুষ্য হিসাবে যতটুকু বোধ আছে তা থেকেই লিখলাম। আমরা কিছুক্ষনের মধ্যে এম্বাসির অন্য বিল্ডিং গিয়ে কুপন নিলাম আমার নাম্বার ৭৮১ । বারটার পর কুপন দেওয়া বন্ধ আমি ছিলাম শেষ জন। তখন ৭৫০ নাম্বারের ডাক পড়েছে। প্রচুর লোকজন চেয়ারে লাইন দিয়ে বোসে আছে। বেশির ভাগ নর্থ ইন্ডিয়ান,কিছু সাউথের লোক আছে । কাউন্টারে এক মহিলা অফিসার কাউকে বলে চলেছে এটা দেননি কেন , এখানে হবেনা, ঐ চিঠি চাই , এই পেপার চাই, প্রশাসনিক নিয়ম কানুন ইত্যাদি ,ইত্যাদি। ঘন্টা খানেকের মধ্যে আমার নাম্বার এল। বড় মেয়ে এম্বাসিতে ফোন করে জেনে নিয়েছিল কি কি কাগজ পত্র লাগবে ,সেই মত ডকুমেন্ট নিয়ে গিয়ে ছিলাম। আমাকে কোন কিছু প্রশ্ন করেনি। শুধু বলল তিনটের পর এসে নিয়ে যেতে। আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে তিন মাইল দুরে ব্রিকের রঙের দোকানের কাছাকাছি গাড়ী পার্কিং এ রেখে একটি মেডিটেরিয়ান রেঁস্তরাতে খেতে গেলাম। সেখানে সবরমা চিকেন রোল, হোমাস, বেগুন টমেটো আরো কি সব দিয়ে একটি ডিস, আলুভাজা, পিটা ব্রেড, সব খেতে পারলাম না বেঁধে বাড়ী নিয়ে এলাম । তারপর ব্রিকে কয়েকটি রঙের বোতল বদলকরে অন্য ব্রেন্ডের রং মিডিয়াম নিলাম। তারপর এম্বাসিতে গিয়ে কাউন্টারে দাঁড়াতে আমার লাইফ সাট্রিফিকেট ও পাসপোর্ট হাতে দিয়ে দিল। আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। বাড়ী ফিরে এলাম। আজ পনেরই নভেম্বর বৃহস্পতিবার দুই সপ্তাহের জন্য আমি আমার ছোট মেয়ে প্রিনস্টনে এসে পৌঁছেছি। তবে গাড়ী করে আসিনি। এসেছি আমেরিকার বিখ্যাত বাস পরিসেবা গ্রেহাউন্ড বাসে করে। ছোট বেলা এই গ্রেহাউন্ড বাসের লোমহর্সক কাহিনী পড়েছি। ভোর সাড়েচারটায় ঘুম থেকে উঠে সাড়ে পাঁচটায় মেয়ে কলেজ পার্কে গ্রেহাউন্ড বাসে উঠিয়ে দিয়ে এল । বাস স্টেন্ডে আগে থেকে গাড়ীর মধ্যে অপেক্ষা করছিলাম। কারন বাহিরের তখন তাপমাত্রা এক ডিগ্রী। বাসটি আসছে ওয়াশিংটন ডি সি থেকে। শুনসান কেউ কথাও নেই ভাবলাম ভুল জায়গায় অপেক্ষা করছিনাতো। মেয়ে মোবাইল এ্যপ খুলে দেখে নিল বলল আমরা ঠিক জায়গায় আছি একটু পরেই বাস চলে আসবে। সত্যিই তাই হল। বাস এসে স্টেন্ডে দাঁড়ালো । আমরা কাছে গিয়ে দাঁড়াতে বাস থেকে ড্রাইভার নেমে এল আমরা উইস করলাম। আমাদের টিকিট চেক করে আমাদের সুটকেস দুটো নিয়ে লাগেজ চেম্বারে ঢুকিয়ে বন্ধ করে দিল। যেই ড্রাইভার সেই খালাসি। আমরা ভিতরে গিয়ে বোসলাম। দেখলাম ভিতরে আমরা মাত্র দুই জন। পুরো বল্টিমুর পর্যন্ত আমরা বাপ বেটি। বল্টিমুর থেকে অন্য বাসে আসতে হবে ফিলাডেলফিয়া , পেন্সিলভেনিয়ার কেপিটল যেখানে বিখ্যাত আফ্রিকান আমেরিকান আর্টের মিউজিয়াম ও নাম করা আর্ট কলেজ আছে। এই শহরেই তৈরী হয়েছিল আমেরিকার কনস্টিটিউশন । আগে থেকে জানানো ছিল শত্রুঘ্ন সেখান থেকে গাড়ী করে নিয়ে যাবে। আজকের আবহাওয়া ফোরকাস্টে ছিল সারাদিন বৃষ্টি অথবা স্নো ফল হবে। আমরা যতই বল্টিমুরের দিকে এগোতে থাকলাম একটু বৃষ্টি পরে অল্প অল্প স্নো ফ্লেক্স পড়তে শুরু করেছে। এক ঘন্টার মধ্যে বল্টিমুরে পৌঁছে গেলাম। ড্রাইভার তার সিট থেকে নেমে এসে আমাদের সুটকেস নামিয়ে দিল । আমরা গ্রেহাউন্ড বাসের টার্মিনালে ওয়েটিং রুমে গিয়ে বোসলাম, পরবর্তি বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম , আমাদের মত অনেকে অপেক্ষা করছে বিভিন্ন ডেস্টিনেশানে যাওয়ার জন্য। আধা ঘন্টার মধ্যে আমাদের বাস চলে এল। ওদের লোকেরাই আমাদের লাগেজ উঠিয়ে দিল। সব মিলিয়ে দশ বারজন হবে। সময় মত বাস ছেড়েদিল। দুই ঘন্টার পথ বাস ছুটছে তখন থেকে অল্প অল্প বৃষ্টির সাথে স্নো ফ্লেক্স পোড়তে শুরু করেছে।দিন বার আগে দেখে গেছি গাছে কত রং এখন শুক্নো মৃত প্রায় দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যখন ডেলাঅয়ারে পৌঁছালাম তখন শত্রুঘ্ন ফিলাডেলফিয়া চলে এসেছে আমাদের নিতে। মেসেজ করেছে। চল্লিশ মিনিটের মধ্যে আমরা চলে এলাম। বাস ফিলাডেলফিয়া শহরে গ্রেহাউন্ড টারমিনালে ঢুকছে বাসের পেছনে পেছনে শত্রুঘ্নের গাড়ী। আমরা যখন বাস থেকে নামলাম আমাদের লাগেজও নেমে গেছে , সাথে সাথে ডিগির তে ভোরে রওনা হলাম। চল্লিশ মাইল রাস্তা এক ঘন্টার পথ গল্প করতে করতে বাড়ী এসে গেলাম । বাড়ী পৌঁছেছি আর শুরু হয়ে গেল তুষার পাত বিকেল পর্যন্ত থামার নাম নেই ,চারিদিক সাদা আর সাদা, এ বছরে প্রথম খুব আগে স্নো ফল শুরু হল। বেশির ভাগ গাছের পাতা ঝরে গেছে। দিনবারো আগে এসেছিলাম তখন কত রং ছিল গাছে। দেড় সপ্তাহের মধ্যে সব বদলে গেছে। গতকাল মাইনাস এক ছিল এখন দুপুর চারটে হবে তাপমাত্রা পাঁচ ডিগ্রী। পনের দিন এখানে থাকব আর ছবি আঁকব । আর আগামী শনিবার থ্যাঙ্কস গিভিং ডে উপলক্ষে আমার মিলিটারি স্কুলের আমেরিকাবাসি অনেক ছাত্ররা আসছে। ……………

“ আমেরিকার ডায়েরি ৯ "
( পত্র ঝর )

আমেরিকায় ফল ( Fall ) শুরু হয়ে গেছে । আমাদের বাড়ীর কাছের গাছপালা ও লেকের ধারে সবরকম গাছে শীতের আগে তাদের রঙে ভোরে উঠেছে প্রকৃতি। রং আর রং চোখ ধাঁধানো রং। আমাদের দেশে বসন্ত কালে পাতা ঝরে , আর শান্তিনিকেতনে বা পাশাপাশি কয়েকটি জেলায় পলাশের রঙে রাঙা হয়, আর শাল, পিয়াল, আমলকি ও আরো সব গাছে পাতা ঝরে আবার সবুজ নুতন পাতা ভোরে যায়। কিন্তু এখানে তা হয় না , এখন রং ধরিয়ে মন ভরিয়ে আগামী চার মাসের বেশী বৈরাগ্যের বেশ। ঠান্ডায় কুকড়ে জির্ন শরীরে উর্দ্ধবাহু হয়ে কঙ্কালের মত দাঁড়িয়ে থাকবে। আমাদের জীবনেও এইরকম হয় মাত্র একবার, বছরে বছরে নয়। ছাত্র জীবন থেকে যৌবন কখন এসে চলেগেল বুঝতেই পারলামনা কিন্তু মনে রং আছে তা নাহলে আমার আঁকা ছবিগুলো সাদা কালো হত। কিন্তু তা ত হয় না। জীবনের বসন্তে ভ্রমর প্রজাপতিরা এসে উড়ে বেড়ায় আর আমেরিকায় গাছে রঙের বসন্তে কত রকম পাখি হুনো হুনো কাঠবিড়ালী কত পরিয়ারী গুজ কানাডার খুব ঠান্ডা জায়গা থেকে উড়ে এসে লেকের জলে জলকেলি করছে। আমি প্রতিদিন লেকের ধারে হাঁটতে যাই আর দেখি দিন দিন গাছের রং বদলে যাচ্ছে , আমি মোবাইলে ছবি তুলি আর মনের ভিতর ধরে রাখি তার রুপ। ঠিক যেন মনে হয় ছাত্র জীবনের সেই দিনগুলির কথা । কোন এক যুবতির সাথে চলেছি ইডেন গার্ডেনে স্কেচ্ করতে। ব্যান্ডস্ট্যান্ড, প্যাগোডা আর গাছপালাতে ঢাকা, তখন ইডেনের বড় স্টেডিয়াম তৈরী হয়নি। যুবক চুনী গোস্বামী সাদা হাফপ্যান্ট ও টিশার্ট পরা গেট দিয়ে বেরিয়েছে, আমাদের বন্ধু স্বপন চাকী বলে উঠল আরে দেখ চুনী গোস্বামী বেশী দুরে নয় সে আমাদের উদ্দেশ্য করে হাত নাড়াল। আমেরিকায় এসে দেখছি ফল, আর লিখছি কিনা ইডেন গার্ডেনে চুনী গোস্বামী। কিন্তু কি করি মনে যে চলে আসে তাই বাদ দিইনি। বসন্তের কথা উঠলে কত ছবি ভেসে উঠে। যাইহোক আজ আমরা ফল দেখতে চলেছি পোকনোস, আজকে আমরা যাব প্রিনস্টন শত্রুঘ্নরে কাছে , আগামীকাল বিকেলে যাব পোকনোসে। সেখানে শত্রুঘ্নের একটা চল্লিশ একরের জায়গায় বড় বাড়ী ও লেক আছে সেখানে প্রায় বিয়ের অনুষ্ঠান হয় । ওয়াকিং ট্রেল আছে। সেখানে আমরা দুইদিন থাকব। এদিকে মদন ভিমরি আমাদের সাথে দেখা করার জন্য পথ চেয়ে আছে। গত কাল রাজিব শ্রীবাস্তব এ্যাটলান্টা থেকে ফোন করেছিল কখন আমি তার কাছে যাব । আমাকে তার কাছে গিয়ে ঘুরে আসতেই হবে। আকাশ পথে দুই ঘন্টার পথ। দরকার হলে প্রাইভেট জেট প্লেন আমাদের বাড়ীর কাছাকাছি ছোট এয়ার পোর্টে পাঠিয়ে দেবে। তার তিন খানা বাচ্চাদের ক্লিনিক আছে। আমি বলেছি আসার চেষ্টা করছি। তবে জাহাজ পাঠাতে হবেনা। এদেশে আত্মিয় স্বজন নেই কাজ আর কাজ তাদের মাষ্টার মশাই এসেছে আমেরিকায়, তারা কাছে পেতে চায়। দ্বিতীয় বারে সে আমাদের রিচমন্ড নিয়েগিয়েছিল, আমার বৌ বলছে সত্যই তুমি ভাগ্যবান। গতকাল আমরা প্রিনস্টনে এসে পৌঁছেছি , মেরিল্যান্ড থেকে প্রিনস্টনে আসার পথে রাস্তার দুইধারে জঙ্গলে যেন রঙের আগুন লেগেছে। আমরা বিকেল সাড়ে চারটার পর বেরিয়ে ছিলাম, মাঝ পথেই সন্ধ্যে হয়ে গেল । বল্টিমুরের আগে একটু ট্রাফিক থাকায় আমাদের আধা ঘন্টার মত বেশী সময় লাগল তিনশ পনের কিলোমিটার পথ তিন ঘন্টা চল্লিশ মিনিটে চলে এলাম। শত্রুঘ্ন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তার পর আমরা একটু ঠিকঠাক হয়ে রাত্রির ডিনার করলাম গরম গরম রুটিতে ঘি মাখিয়ে নানি প্যায়ারীজি দিয়ে যাচ্ছে তার সাথে ডাল, সর্ষের শাক, বাঁধা কফির তরকারি, শেষে জিলেবী, তারপর রাত্রি বারটা পর্যন্ত অনেক গল্প, গল্পের বিষয় ধর্ম বিশ্বাস মানুষের মনের দুর্বলতা এবং তাকে হাতিয়ার করে যুগ যুগ ধরে সমাজে কর্তৃত্ব ফলানো। ভারতের মানুষ শুধু ধর্মান্ধ নয় এই সাদার দেশেও কম নয়। এই সাত পাঁচ গল্প করে তিনচার ঘন্টা কেটে গেল, তারপর পর ঘুমাতে গেলাম। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেছি ছোট মেয়ে ডাকছে বলছে বাবা বাহিরে এসে দেখে যাও কি রং ধরেছে গাছে, সত্যি বাড়ীর বাহিরে বেরিয়ে দেখি চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া রং। অনেক ছবি তুললাম , শত্রুঘ্নের বাড়ীর চার ধারে গাছের কত রকমের রং আর যে রঙিন পাতা গুলি ঝরে পড়েছে আমাদের দেশে হোলির রং কে ছাড়িয়ে যাবে সেই রঙে ছন্দ আছে ফর্ম নেই কিন্তু এখানে প্রতিটি রঙে ফর্ম আছে কোনটা অর্ধ গোলাকৃতি , লম্বা, কোথাও যেন রঙের দেওয়াল। কোথাও জলের উপর রঙের প্রতিবিম্ব। এক এটি ফ্রেম এক একটি ছবি। তারপর সকালের ব্রেকফাস্ট । গরম গরম আলুর পরোটা দৈ আমের আচারের সাথে ব্রেকফাস্ট সেরে একটু পরে বের হলাম জেরির রঙের দোকানে । আগের বারে অনেক ছবি আঁকার জিনিষপত্র কিনেছিলাম তার মধ্যে স্টেপলার গানটা খারাপ ছিল , সেটা বদল করে আরো কিছু জিনিষ কেনা হল। আমার এই সব রঙের দোকানে ঢুকলে মাথা ঘুরে যায়। ক্যানভাসের বোর্ড প্যাড দশটা করে থাকে ১৬x২০ ইন্চি সাইজ। সেখানে যাওয়া আসার পথে দেখলাম গাছের রঙের বাহার । গতকাল প্রিনস্টন থেকে পোকনোস এসে পৌঁছেছি । আসার পথে রাস্তার দুই ধারে শুধু গাছের জঙ্গল গায়ে রং মেখে দাঁড়িয়ে আছে । জঙ্গলের বুক চিরে চলেছে চওড়া রাস্তা তার উপর দিয়ে ছুটে চলেছে শত্রুঘ্নের এস ইউ ভি গাড়ী । শত্রুঘ্ন চালাচ্ছে আমি তার পাশে ছবি তুলতে তুলতে চলেছি আর পিছনের দুটি রোয়ে , পুনিত, আর মেহের ও আমার বৌ বাচ্চারা। রাস্তায় আবার বৃষ্টি শুরু হল , বন্ধ হওয়ার নাম নেই বৃষ্টির মধ্যে চলেছি অন্ধকার মাঝে মাঝে শুধু আগের গাড়ীর পিছনের লাল লাইট দেখা যাচ্ছে, ঘন্টা আড়াই বাদে পোকনোস থেকে কুড়ি মাইল আগে একটি ইন্ডিয়ান রেঁস্তরাতে খেয়ে আমরা রওনা হলাম। আমাদের সাথে রেঁস্তরাতে শত্রুঘ্নের ম্যানেজার জামাল এসে যোগ দিয়েছিল। এখন পুনিত গাড়ী চালাবে, শত্রুঘ্ন জামালের গাড়ীতে বোসল , একটু পাহাড়ের রাস্তা কিন্তু বোঝা যাচ্ছ না অন্ধকার তারপর বড় রাস্তা থেকে জঙ্গলের ছোট্ট রাস্তায় ঢুকলাম কিছু দুর যাওয়ার পর দেখলাম লেখা আছে প্রাইভেট রোড় , সেখান থেকে কিছুটা গিয়ে গাড়ী একটা উঁচু জায়গায় প্রাসাদসম বাড়ীর বিরাট বিরাট পিলার দেওয়া একটি লম্বা কেনাপির নিচে গাড়ী থামল। একটু পরেই জামাল শত্রুঘ্নকে নিয়ে পৌঁছে গেল । বিশালতম কাঠের পালিশ করা দরজা দিয়ে আমরা ঢুকলাম আমাদের জিনিষ পত্র নিয়ে। ভিতরে ঢুকে দেখলাম সে এলাহী ব্যাপার। ঘরের ভেতরে ছোট্ট সুইমিং পুল,কাঁচ দিয়ে ঘেরা পাশে জাকুজির ব্যাবস্থা আমরা আসব বলে আগেথেকে গরম জলের মেশিন চালু করে রেখেছে। তারপর শত্রুঘ্ন একের পর এক ঘর দেখাতে লাগল। চল্লিশ জনের থাকার ব্যাবস্থা আছে । বাড়ীর বাহিরে আরো অনেক গুলি ঘর আছে। সেগুলি আরো নানা কাজে ব্যাবহার হবে। চল্লিশ একর জায়গায় কারো বাড়ী নেই শুধু জঙ্গল গাছপালাতে ভর্তি একটা ছোট্ট লেকের মত আছে। মাঝে ভালুকের দেখা মেলে জামাল সেই কথাই জানালো। রাত্রির খাওয়া সেরেই এসেছি। এখন একটু বিশ্রাম করে করে ঘুমানোর পালা। দোতালার তিনটি রুমে আমরা সবাই চলে এলাম। তখন মেহের ঘুমিয়ে পড়েছে। বেশ ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে এবং তার সাথে হাওয়া, জঙ্গলের ভিতরে এই মহলে শহরের মত সমস্ত আধুনিক ব্যাবস্থা আছে। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত, ওআই ফাই , রান্না করার যতরকম ওভেন , গ্রিল, মাইক্রোওভেন, বার , বিলীয়ার্ড টেবিল আরো কত কি জিনিষ পত্রে ঘরটি সাজানো। যাইহোক রাত্রিতে নরম বিছানায় ভালই ঘুম হল। সাড়ে আটটায় সবাই ঘুম থেকে উঠে যখন নিচে নামলাম তখন মেহের লাইভ জ্যাকেট পরে ঘরের ভিতর ছোট্ট পুলের গরম জলে ঝাঁপ দিল, মেশিনে জলের ফ্লো হচ্ছে তাতে সামনের দিকে এগোতে গেলে কসরত করতে হবে। এদিকে শত্রুঘ্ন চা বানাচ্ছে, আমাকে গরম জল করে দিল । সকালে ব্রেকফাস্টের জন্য আমি শত্রুঘ্ন দুজনে মিলে একটু দুরে দোকান থেকে ডিম কলা কিছু কেক অরেঞ্জ জুস খাওয়ার দাওয়ার কিনে এনে দিলাম। আমার ছোট মেয়ে ডিম দিয়ে স্ক্র্যামবেল্ড এগ বানাল, তার সাথে কেক, কলা, অরেঞ্জ জুস খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম । শত্রুঘ্ন তার আর একটি বাড়ী দেখাতে নিয়ে গেল । বাড়ীটি একটি বিশাল লেকের ধারে,আর একটু দুরে পাহাড়ের গায়ের স্লোপ কেটে স্কি খেলার তিনটি স্লোপ বানানো। আর মাস খানেকের মধ্যে স্নো পোড়তে শুরু করবে আর নানা জায়গা থেকে দলে দলে স্কিয়ার রা এসে হাজির হবে, তারা বাড়ী ভাড়া করে থাকে বা এয়ার বি এন বি তে কয়েক দিনের জন্য ভাড়ায় দেওয়া হয়। সেই বাড়ীটিতে মেঝে থেকে কার্পেট উঠিয়ে উডেন ফ্লোরিং করা হচ্ছে। সেখানে আমরা কিছুক্ষন কাটালাম। সেখান থেকে লেকের উল্টোদিকে একটি আমেরিকান রেঁস্তরাতে লাঞ্চ করতে গেলাম। সেখানে নানা রকম হাল্কা খেয়ে আমরা গেলাম প্রিমিয়াম হান্ড্রেড স্টোর শপিং মলে। সেখানে সমস্ত ব্যান্ডের ফ্যাক্ট্রি সেল হাফ দামে বিক্রি হচ্ছে। শনিবার ছুটির দিন বেশ ভীড়, জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছে তার উপর হাওয়া, কন কনে ঠাণ্ডা , আজ রাত্রিতে এক ডিগ্রীতে তাপ মাত্রা নামবে। সকালে উঠে দেখলাম সুন্দর রৌদ্রে চারিদিক ঝলমল করছে। একটু পরে বাহিরে দেখলাম কত গুলি হরিন বাড়ীর কাছাকাছি এসে ঘাস খাচ্ছে। আমি একটু কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলাম ছবি তোলার জন্য, অমনি কান খাড়া করে একি ভঙ্গিতে পাথরের মুর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে , কয়েকটি ছবি তুললাম, তারপর যেই না এগিয়েছি ওমনি ল্যাজ তুলে লাফিয়ে লাফিয়ে জঙ্গলে চলে গেল। পোকনোসে ফল প্রায় শেষের দিকে, নিউজার্সিতে এখন পুরো ফলের রং উপভোগ করলাম। পোকনোস একশ মাইলের বেশী নর্থে তাই এই দিকে ফল আগে আসে যাই হোক অনেক ছবি তুলেছি সবাইয়ের ভাল লাগবে। গতকাল সন্ধ্যার সময় আমরা পোকনোস মাউন্টেইন থেকে প্রিনস্টন হয়ে দুই রাত্রি থেকে মেরিলেন্ডে এসে পৌঁছেছি। আজ দীপাবলী সবাইকে শুভ কামনা জানাই। গতদুইদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। আজকে সকালে রদ্দুর আকাশ পরিষ্কার দেখে হাঁটতে গেলাম। লেকের ধারে জঙ্গলে এত পাতা ঝরেছে তারি উপরদিয়ে হাঁটলাম, গাছের রং এখনো আছে তবে অনেক গাছের পাতা ঝরেগেছে। ঝরার যা তা ঝরে যাবে আমি আটকানোর কে ? আমি দর্শক, পার্ফর্মার নই সুতরাং যা ঘটে তাই দেখি। আজ দীপাবলী আলোর উৎসব, অন্ধকার থেকে প্রকাশের দিকে উন্মোচিত হওয়া। অজ্ঞান থেকে জ্ঞানের সন্ধানে পথ চলা। দুর্বৃত্তায়নের পথ ছেড়ে মহত্তের সাধনা। এটাই হল প্রতিকী আলোর উৎসব। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চলছে আলোর মেলা আর পশ্চিমবংঙ্গে কালীপুজো, তার সাথে, ভাইফোঁটা। আমি বিদেশে প্রকৃতির কোলে উপভোগ করছি রঙের উৎসব। দেখতে দেখতে আড়াই মাস কেটে গেল বাড়ীর সবাই আছি ঘুরে বেড়াচ্ছি তাই মনে হচ্ছেনা বিদেশে আছি। কিন্তু একটা কিছুর অভাব অনুভব হয়। নিজের দেশ তার মাটির গন্ধ আলাদা । তবে সে যাই হোক সে মোর কাঁচা ঘর খাসা।…………………..